মারা গেলেন জাপানি মাঙ্গা শিল্পী তেৎসুয়া চিবা বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর

‘আশিতা নো জো’র স্রষ্টা তেৎসুয়া চিবা আর নেই

জাপানের জনপ্রিয় বক্সিং মাঙ্গা সিরিজ ‘আশিতা নো জো’র চিত্রশিল্পী তেৎসুয়া চিবা মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। জাপানের টোকিওর একটি হাসপাতালে গত ২২ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছে। সাত দশকের কর্মজীবনে চিবা জাপানের মাঙ্গা জগতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁর সৃষ্টিতে খেলাধুলার পাশাপাশি যুদ্ধ-পরবর্তী জাপানের সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, হতাশা ও আশাবাদের চিত্র উঠে এসেছে।

‘আশিতা নো জো’ দিয়ে ব্যাপক পরিচিতি

তেৎসুয়া চিবার সবচেয়ে পরিচিত কাজ ‘আশিতা নো জো’। ১৯৬৮ সালে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ শুরু হওয়া এই বক্সিং কাহিনির কেন্দ্রীয় চরিত্র জো ইয়াবুকি—এক সমস্যাগ্রস্ত তরুণ, যে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে পেশাদার বক্সার হয়ে ওঠে। গল্পে তার প্রশিক্ষণ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে।

সিরিজটির চিত্রায়ণে চিবার সঙ্গে কাজ করেন লেখক আসাও তাকামোরি, যিনি ইক্কি কাজিওয়ারা নামেও পরিচিত। তাঁদের যৌথ কাজটি জাপানের জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে বিশেষ জায়গা করে নেয়। খেলাধুলাভিত্তিক মাঙ্গাকে জনপ্রিয় ধারায় পরিণত করার ক্ষেত্রেও সিরিজটির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।

‘আশিতা নো জো’র প্রভাব শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি অবলম্বনে অ্যানিমে সিরিজ, চলচ্চিত্র, ভিডিও গেম, টেলিভিশন বিজ্ঞাপন ও মঞ্চনাটক তৈরি হয়েছে। গল্পের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চরিত্রের মৃত্যুর পর ভক্তদের উদ্যোগে প্রতীকী শেষকৃত্যের আয়োজনও করা হয়েছিল। ঘটনাটি সিরিজটির জনপ্রিয়তা ও দর্শকদের আবেগের পরিচায়ক হয়ে ওঠে।

খেলাধুলার গল্পে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবন

চিবার মাঙ্গার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তরুণ ক্রীড়াবিদদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পাশাপাশি তাঁদের ব্যক্তিগত সংগ্রাম তুলে ধরা। বক্সিং ছাড়াও গলফ, কেন্দোসহ বিভিন্ন খেলা তাঁর সৃষ্টির বিষয় হয়েছে।

তাঁর কাজগুলোতে যুদ্ধ-পরবর্তী জাপানের সামাজিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। দারিদ্র্য, হতাশা, আনন্দ, ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ—এসব বিষয় তাঁর গল্পে ফুটে উঠেছে। ফলে তাঁর মাঙ্গা কেবল খেলাধুলার বিনোদন হিসেবে নয়, মানুষের জীবন ও সমাজকে দেখার একটি মাধ্যম হিসেবেও পাঠকদের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে।

সাত দশকের কর্মজীবন ও সম্মাননা

দীর্ঘ কর্মজীবনে চিবা মাঙ্গা শিল্পী হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রেও যুক্ত ছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতা করেছেন এবং জাপান কার্টুনিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। নবীন শিল্পীদের বিকাশেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

জাপানের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কোদাংশা তাঁর নামে ‘তেৎসুয়া চিবা পুরস্কার’ চালু করে, যার মাধ্যমে নতুন মাঙ্গা শিল্পীদের কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে এই পুরস্কার নবীন শিল্পীদের পেশাদার জগতে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।

শিল্প ও সংস্কৃতিতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে চিবা একাধিক সম্মাননা পেয়েছেন। ২০২৪ সালে তিনি জাপানের মর্যাদাপূর্ণ ‘অর্ডার অব কালচার’ লাভ করেন। এই স্বীকৃতি জাপানের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর দীর্ঘদিনের অবদানের গুরুত্ব তুলে ধরে।

যুদ্ধের স্মৃতি থেকে শান্তির পক্ষে অবস্থান

চিবার ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতাও তাঁর চিন্তাভাবনায় প্রভাব ফেলেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শৈশবের একটি অংশ তিনি চীনে কাটান। যুদ্ধের পর জাপানের পরাজয়ের প্রেক্ষাপটে পরিবারসহ দেশে ফিরে আসেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি যুদ্ধের স্মৃতি এবং শান্তির প্রতি নিজের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেছেন।

তেৎসুয়া চিবার মৃত্যুতে জাপানের মাঙ্গা জগতের দীর্ঘ ও প্রভাবশালী এক অধ্যায়ের অবসান হলো। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র, খেলাধুলাভিত্তিক গল্প এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বহু প্রজন্মের পাঠকের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Leave a Comment