জাপান সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
নিজস্ব প্রতিবেদক | ভূমিকা নিউজ
জাপানে চার দিনের সরকারি সফর শেষ করে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাতের শেষভাগে তাঁকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এ সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি ছয়টি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা দলিল স্বাক্ষর এবং প্রায় ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের দুটি ঋণ সহায়তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন জানান, প্রধানমন্ত্রী, তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং সফরসঙ্গীদের বহনকারী ফ্লাইটটি শুক্রবার রাত ২টা ৪৮ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছায়। এর আগে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) জাপানের স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইটটি ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে।
বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলীসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
জাপান সফরে গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা ও বিনিয়োগ আলোচনা
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে গত ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর দেশটি সফর করেন তারেক রহমান। সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ছিল ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক। সেখানে দুই দেশের নেতারা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে এক ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা প্রায় ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়। এই বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে জাপানি একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
সফরকালে দুই দেশের মধ্যে ছয়টি সরকারি পর্যায়ের সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়। এ ছাড়া ৪৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা প্রায় ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের দুটি ইয়েন-ঋণ প্রকল্পে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়।
এসব সমঝোতার মধ্যে ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়ন, কৃষি, দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সহযোগিতা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার বিষয় রয়েছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদারে টহল জাহাজ সংগ্রহের জন্য ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ১৩ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অনুদান সহায়তার চুক্তিও হয়েছে।
ঋণ সহায়তার আওতায় বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং উপজেলা শাসন ও উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নে সহায়তা দেওয়া হবে।
জাপানি ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান
গত ২৮ অক্টোবর টোকিওতে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) সদর দপ্তরে আয়োজিত বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক ফোরাম ডায়ালগে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি জাপানি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের পাঁচটি অগ্রাধিকার খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
খাতগুলো হলো অটোমোবাইল উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ, উচ্চগতির রেল ও লজিস্টিকস এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প। বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং সরকারি সহযোগিতার আশ্বাসও দেন তিনি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি পর্যায়ের চুক্তির পাশাপাশি জেট্রোর মাধ্যমে দুই দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
জাপানের শিল্প ও অবকাঠামো পরিদর্শন
সফরের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী জাপানের বিভিন্ন রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসো, জাইকার প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকা, জেবিআইসির গভর্নর কাজুহিকো আমাকাওয়া এবং জেট্রোর প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকা।
এ ছাড়া ইউনিক্লো, মিতসুই অ্যান্ড কোং, সুমিতোমো করপোরেশন ও জেরা কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষতা উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।
২৭ অক্টোবর ফুত্তসুতে জেরার এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ইচিকাওয়াতে নিতসুর লজিস্টিকস হাব পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। পরদিন ২৯ অক্টোবর নাগোয়ার টয়োটা মোটর করপোরেশনের মোতোমাচি কারখানা ও টয়োটা মেমোরিয়াল মিউজিয়াম অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড টেকনোলজি ঘুরে দেখেন।
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা
জাপান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। ঢাকা মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে দেশটির সহযোগিতা রয়েছে।
এ সফরে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রথম অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকর করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। সফরে আলোচিত বিনিয়োগ ও সহযোগিতার উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বাণিজ্য, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

