যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে সহযোগিতা আরও গভীর করতে উদ্যোগ নিয়েছে কানাডা। এ লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার কানাডার মন্ট্রিলে শুরু হওয়া সম্মেলনে দুই পক্ষের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরুর বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
মন্ট্রিল থেকে বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন গত মাসে কানাডাকে ২৭ সদস্যের ইইউর প্রথম ‘সহযোগী সদস্য’ করার সম্ভাবনার কথা তুলেছিলেন। তবে ইইউর বিদ্যমান চুক্তিতে এ ধরনের সদস্যপদের স্বীকৃতি নেই। কয়েকটি সদস্যদেশের আপত্তির কারণে সম্মেলনসংক্রান্ত যৌথ বিবৃতির খসড়া থেকেও ‘সহযোগী সদস্য’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
তা সত্ত্বেও বুধবার মন্ট্রিলে পৌঁছে ফন ডার লিয়েন বলেন, কানাডাকে ইইউর প্রথম সহযোগী সদস্য করার বিষয়ে আলোচনা কীভাবে শুরু করা যায়, তা নিয়ে দুই পক্ষ কথা বলবে। তিনি এই সম্মেলনকে দুই পক্ষের অভিন্ন ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবেও বর্ণনা করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির প্রভাব
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন—উভয়ের জন্যই উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। কানাডার অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাত মার্কিন শুল্কের কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে। পাশাপাশি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে ট্রাম্পের বারবার করা মন্তব্য দেশটিতে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এখন তাঁর দেশের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে চুক্তির প্রতিশ্রুতি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি সব সময় নির্ভরযোগ্য নাও হতে পারে।
সম্মেলনের আগে কার্নি বলেন, বিশ্ব আরও বিপজ্জনক ও বিভক্ত হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন পরস্পরের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সহযোগিতা বাড়াতে চায়। তিনি দুই পক্ষের মধ্যে একটি নতুন ও উচ্চাভিলাষী অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রত্যাশাও জানিয়েছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ইউরোপীয় রাজনৈতিক নেতাদের সমালোচনাও দুই পক্ষের সম্পর্কের প্রেক্ষাপটকে প্রভাবিত করছে। ফন ডার লিয়েনের ভাষ্য, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বাড়ার কারণে ইইউ বিশ্বস্ত অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে চায়। তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে কানাডার সঙ্গে কাজ শুরু করাটা স্বাভাবিক।
বাণিজ্য, জ্বালানি ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতার পরিকল্পনা
কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ইতোমধ্যে একটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। তবে চুক্তিটির পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো বাকি। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কানাডীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ইউরোপের বাজারে নতুন সুযোগ খুঁজছে।
ইইউর এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন অংশীদারত্বের আওতায় জলবায়ু, জ্বালানি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নীতিগত সমন্বয় বাড়ানো হতে পারে। এর ফলে কানাডা ইইউর কিছু কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে এবং দুই পক্ষের মধ্যে যৌথ পরিচালনাকাঠামো গড়ে তোলার পথ তৈরি হতে পারে।
ডিজিটাল বাণিজ্যও আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সম্মেলনে অনলাইন লেনদেন আরও দ্রুত ও সাশ্রয়ী করতে একটি ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি ঘোষণার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি এআই অবকাঠামো ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান নিয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
AFP+1
গুরুত্বপূর্ণ খনিজে ইউরোপের আগ্রহ
সবুজ প্রযুক্তি, বিশেষ করে ব্যাটারি ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের যন্ত্র তৈরিতে প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বড় মজুত রয়েছে কানাডায়। ইউরোপ বর্তমানে এসব খনিজের উল্লেখযোগ্য অংশ চীন থেকে সংগ্রহ করে। ফলে সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করা এবং কৌশলগত খনিজের সরবরাহ নিরাপদ করার ক্ষেত্রে কানাডার সঙ্গে সহযোগিতা ইইউর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কানাডার খনিজ উত্তোলন খাতের সম্প্রসারণে বড় অঙ্কের অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের মাধ্যমে কানাডার গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রকল্পগুলোতে অর্থায়নের সুযোগ তৈরির বিষয়টি সম্মেলনে আলোচনায় আসতে পারে।
AFP+1
শিক্ষার্থী ও তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ
বাণিজ্য ও প্রযুক্তির পাশাপাশি শিক্ষা ও তরুণদের বিনিময় কর্মসূচিও নতুন অংশীদারত্বের অংশ হতে পারে। কানাডার শিক্ষার্থীদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ইরাসমাস’ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে অটোয়া ও ব্রাসেলস কাজ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরাসমাস কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিদেশে পড়াশোনা ও শিক্ষাবিনিময়ের সুযোগ পান। কানাডার অংশগ্রহণের পথ তৈরি হলে দুই পক্ষের শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়তে পারে।
নামের চেয়ে বাস্তব সুফলকে গুরুত্ব দিচ্ছে কানাডা
কানাডাকে ইইউর ‘সহযোগী সদস্য’ করার প্রস্তাব নিয়ে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক গভীর করার বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে চলছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, নতুন অংশীদারত্বকে কী নামে ডাকা হবে, তার চেয়ে কানাডার মানুষের জীবনে এটি কী পরিবর্তন আনবে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২৯ ও ৩০ অক্টোবর মন্ট্রিলে অনুষ্ঠিতব্য ইইউ-কানাডা সম্মেলনে বাণিজ্য, ডিজিটাল সহযোগিতা, গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও গবেষণাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা।
