রোবট প্রশিক্ষণ থেকে ডিজিটাল টুইন, চীনে এআই শিল্পে নতুন পেশার বিস্তার

চীনে এমবডিড কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শিল্পের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। রোবটকে বাস্তব কাজের উপযোগী করে প্রশিক্ষণ দেওয়া, ভার্চুয়াল পরিবেশ তৈরি, সিস্টেম চালু করা এবং রক্ষণাবেক্ষণের মতো কাজে বাড়ছে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ও চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সেপ্টেম্বর মাসে চীনের মানবসম্পদ ও সামাজিক নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি সরকারি বিভাগ এমবডিড এআই রোবট অ্যাপ্লিকেশন টেকনিশিয়ান ও ডিজিটাল টুইন প্রকৌশলীসহ ১১টি নতুন পেশাকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

রোবটকে বাস্তব কাজের উপযোগী করছেন প্রযুক্তিবিদেরা

চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ছোংছিং পৌরসভার লিয়াংজিয়াং নিউ এরিয়ায় অবস্থিত সেভেন্স রোবোটিকসে কাজ করেন ট্যাং জিশিয়াং। এমবডিড এআই রোবট অ্যাপ্লিকেশন টেকনিশিয়ান হিসেবে তাঁর দায়িত্ব রোবটকে বিভিন্ন ধরনের কাজ শেখানো এবং বাস্তব পরিবেশে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা।

বিভিন্ন পরিস্থিতির অনুকরণ করতে তিনি রোবটের নবের অবস্থান ও কোণ পরিবর্তন করেন। এসব পরীক্ষায় পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এআই মডেলকে। পরে প্রশিক্ষিত মডেল রোবোটিক বাহুতে যুক্ত করে আরও পরীক্ষা ও পরিমার্জন করা হয়।

বারবার পরীক্ষা ও সিমুলেশনের মধ্য দিয়ে রোবটকে বাস্তব পরিবেশে কাজ করার জন্য প্রস্তুত করা হয়। ট্যাংয়ের ভাষ্য, পরীক্ষাগারে কাজ করতে সক্ষম রোবটকে বাস্তব জগতের বিভিন্ন কাজে ব্যবহারযোগ্য করে তোলাই তাঁদের মূল লক্ষ্য।

সেভেন্স রোবোটিকস তেল, রাসায়নিক ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য বিশেষায়িত রোবট তৈরি করে। এসব যন্ত্র ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে মানুষের পরিদর্শনের কাজে সহায়তা করতে পারে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মানুষের পরিবর্তেও কাজ করতে পারে।

তবে এ ধরনের পরিবেশে রোবটের দীর্ঘ সময় নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করার সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য প্রযুক্তিবিদদের রোবটের গতি ও নির্ভুলতা পরীক্ষা করতে হয়। কোনো ত্রুটির পর সেটি আবার কাজ শুরু করতে পারে কি না, কখন কাজ থামাতে হবে এবং কোন পরিস্থিতিতে মানুষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন—সেসব বিষয়ও নির্ধারণ করতে হয়।

বাস্তব স্থাপনার আগেই ভার্চুয়াল প্রশিক্ষণ

এমবডিড এআই খাতে নতুন স্বীকৃতি পাওয়া আরেকটি পেশা হলো ডিজিটাল টুইন প্রকৌশলী। এ পেশার কর্মীরা বাস্তব কোনো কারখানা বা স্থাপনার ভার্চুয়াল প্রতিরূপ তৈরি করেন, যেখানে রোবটকে বাস্তবে ব্যবহারের আগে বিভিন্ন কাজের অনুশীলন করানো যায়।

চীনের ডিজিটাল টুইন প্রকৌশলী জিয়াং লেই ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) পুনর্গঠন প্রযুক্তির সাহায্যে কারখানার ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করেন। সেখানে ভার্চুয়াল রোবটের চলাচলের পথ পরীক্ষা করা যায়। পাশাপাশি, রোবটের ক্যামেরা যন্ত্রপাতির মিটারে থাকা তথ্য সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারছে কি না, সেটিও যাচাই করা সম্ভব।

সিমুলেশনে কাজের নির্ভুলতা নিশ্চিত হওয়ার পর সেই নির্দেশনা বাস্তব রোবটে প্রয়োগ করা যায়। জিয়াংয়ের মতে, আগে রোবট নিয়ে প্রকল্পস্থলে গিয়ে পরিবেশের মানচিত্র তৈরি, চলাচলের পথ নির্ধারণ ও পরিদর্শনের স্থান চিহ্নিত করতে হতো। ডিজিটাল টুইন প্রযুক্তি ব্যবহারে এসব প্রস্তুতি আগেই ভার্চুয়াল পরিবেশে সম্পন্ন করা যায়।

এতে রোবট স্থাপন ও চালুর প্রস্তুতিতে প্রয়োজনীয় সময় দুই থেকে তিন সপ্তাহ থেকে কমিয়ে দুই থেকে তিন দিনে আনা সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে সিমুলেশনের মাধ্যমে অ্যালগরিদম পরীক্ষা এবং মডেল প্রশিক্ষণের জন্য তথ্য তৈরি করা যায়, যা বাস্তব পরিবেশ থেকে তথ্য সংগ্রহের সময় ও ব্যয় কমাতে সহায়তা করে।

ভিন্ন শিক্ষাগত যোগ্যতার মানুষের জন্যও সুযোগ

এমবডিড এআই শিল্পের কাজগুলো ক্রমেই বিশেষায়িত হওয়ায় বিভিন্ন শিক্ষাগত পটভূমির মানুষের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।

যানবাহন প্রকৌশলে পড়াশোনা করা জিয়াং লেই স্বচালিত যানবাহন নিয়ে গবেষণার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে রোবট উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এ কাজে ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি, প্রোগ্রামিং ও সিমুলেশন সম্পর্কে দক্ষতা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, কম্পিউটারবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করা ট্যাং জিশিয়াং রোবট প্রশিক্ষণে রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং ও ইমিটেশন লার্নিং পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি রোবটের গতিবিদ্যা ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে নিজের দক্ষতা বাড়াচ্ছেন।

শিল্পটির প্রসারের ফলে শুধু রোবট তৈরি বা প্রশিক্ষণ নয়, তথ্য সংগ্রহ, এআই মডেল প্রশিক্ষণ, সিস্টেম স্থাপন, পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের মতো ক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞদের চাহিদা বাড়ছে।

চীনের শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে দেশটিতে হিউম্যানয়েড রোবটের মডেলের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে। একই সময়ে উৎপাদিত হিউম্যানয়েড রোবটের সংখ্যা ছিল ৪০ হাজারের বেশি।

দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি

এমবডিড এআই শিল্পের চাহিদা পূরণে দক্ষ কর্মী তৈরির উদ্যোগও নিচ্ছে চীন। চলতি অক্টোবরের শুরুতে বেইজিং সিটি ইউনিভার্সিটি এমবডিড এআইয়ের ব্যবহারিক প্রয়োগ ও প্রশিক্ষণ বিষয়ে একটি কর্মসূচি চালু করেছে।

এ কর্মসূচির আওতায় শিল্প খাতের কর্মীরা পাঁচ দিনের নিবিড় প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি সরাসরি রোবট নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

রোবটের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থানের ধরনেও পরিবর্তন আসছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিবিদেরা। ট্যাং জিশিয়াংয়ের প্রত্যাশা, রোবট মানুষের কাজ পুরোপুরি কেড়ে নেওয়ার পরিবর্তে মানুষের কাজকে আরও সহজ ও নিরাপদ করতে সহায়তা করবে।

তাঁর মতে, রোবটকে এমন কাজে বেশি ব্যবহার করা উচিত, যেগুলো মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, ক্লান্তিকর কিংবা একইভাবে বারবার করতে হয়। এতে কর্মীদের নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

Leave a Comment