ইসরাইলের নির্বাচনে ঝুলে গেল ক্ষমতার হিসাব, নতুন ভোট চান না প্রেসিডেন্ট হারজগ

ইসরাইলের জাতীয় নির্বাচনে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দেশটির রাজনীতিতে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আবারও নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনা এড়াতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রাথমিক ফলাফলে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জোট এগিয়ে থাকলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারেনি। বিরোধী শিবিরের নেতা গাদি আইজেনকোটও সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে পিছিয়ে রয়েছেন। ফলে সরকার গঠনের সমীকরণে আরব দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

AFP+1

সরকার গঠনের হিসাবে এগিয়ে নেতানিয়াহু

বুধবার ৮৫ শতাংশের বেশি ভোট গণনা শেষে পাওয়া প্রাথমিক হিসাবে, ইসরাইলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট ৫৩টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে, আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৪৮। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসন থেকে দুই পক্ষই পিছিয়ে রয়েছে।

চূড়ান্ত ফলাফলে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। তবে প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, কোনো জোট এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারছে না। দুই শিবিরই পরবর্তী সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

ইসরাইলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু কট্টর ডানপন্থী ও অতি-অর্থোডক্স ইহুদি দলগুলোর সমর্থন নিয়ে রাজনীতি করছেন। অন্যদিকে, সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকোট বিভিন্ন বিরোধী দলকে নিয়ে জোট গঠনের চেষ্টা করছেন।

সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আরব দলগুলো

নির্বাচনের প্রাথমিক ফলে ইসরাইলের আরব দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে সরকার গঠনে তাদের সমর্থন দুই প্রধান শিবিরের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জেরুজালেম থেকে এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরব দলগুলোর এই অবস্থান ইসরাইলের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে তাদের সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে বিরোধী শিবিরের ভেতরেও মতপার্থক্য রয়েছে।

ইসরাইলের আরব জনগোষ্ঠী দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ। তাঁদের বড় একটি অংশ ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় সেখানে থেকে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের বংশধর। নেতানিয়াহু সরকারের জাতীয়তাবাদী নীতি এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে অবস্থানের কারণে এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

AFP+1

নতুন নির্বাচন ঠেকাতে রাজনৈতিক দলগুলোকে আহ্বান

প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বুধবার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সমঝোতার মনোভাব নিয়ে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, নির্বাচনের পর আবারও ভোট আয়োজনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়া ঠেকাতে দলগুলোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করা প্রয়োজন।

সরকার গঠনের জন্য কোন নেতাকে প্রথমে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব দেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত নেবেন প্রেসিডেন্ট। চূড়ান্ত ফলাফল পাওয়ার পর তিনি পার্লামেন্টের বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

নেতানিয়াহু ও আইজেনকোট—দুজনই সরকার গঠনের চেষ্টা চালানোর কথা বলেছেন। তবে আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া আইজেনকোটের পক্ষে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কঠিন হতে পারে।

আরব-অধ্যুষিত বামপন্থী জয়েন্ট লিস্টের প্রধান ইউসেফ জাবারিন বলেছেন, নেতানিয়াহুর বিকল্প সরকার গঠন করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে আরব দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। তাঁর মতে, ইহুদি ও আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যে কার্যকর রাজনৈতিক অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, আইজেনকোট আরব দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি জোট গঠনের বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করেছেন। তাঁর জোটে এমন ডানপন্থী নেতারাও রয়েছেন, যাঁরা আরব আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে সরকার গঠনের বিরোধিতা করেন।

আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে বিরোধীদের মতভেদ

আইজেনকোটের শিবিরের অংশ ইসরাইলের প্রধান বামপন্থী দলের নেতা ইয়াইর গোলান প্রথমবারের মতো আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ইহুদি ও আরব ভোটারদের মধ্যে বিভাজনের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করার কথা বলেন।

তবে আরব দলগুলো সরাসরি সরকারে যোগ না দিয়েও পার্লামেন্টের বিভিন্ন ভোটে আইজেনকোটকে সমর্থন দিতে পারে। এমন সমর্থন পেলে তিনি পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়াই সংখ্যালঘু সরকার পরিচালনার চেষ্টা করতে পারেন।

কিন্তু এই ব্যবস্থা কত দিন টিকবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, স্থিতিশীল সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে দেশটিতে আবারও নির্বাচনের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।

AFP+1

ইরান ইস্যুও বাড়াচ্ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা

ইসরাইলের নতুন সরকার গঠনের আলোচনার পাশাপাশি ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। নেতানিয়াহু নির্বাচনী প্রচারণায় ইরানের হুমকি মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। নেতানিয়াহু তাঁর নির্বাচনী বক্তব্যে ইরানের হুমকি স্থায়ীভাবে দূর করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করার সুযোগের কথা উল্লেখ করেছেন।

এদিকে, নির্বাচনের পর আইজেনকোট নেতানিয়াহুকে দেশের নিরাপত্তাকে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, নতুন সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত দায়িত্বে থাকা নেতানিয়াহুর হাতে নতুন নির্বাচনী ম্যান্ডেট নেই।

তবে ইরানে নতুন হামলা চালানো হবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি সম্ভাব্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের ওপরও নির্ভর করতে পারে।

AFP+1

নেতানিয়াহুকে ঘিরে রাজনৈতিক বিভাজন

দীর্ঘ সময় ধরে ইসরাইলের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন নেতানিয়াহু। তবে তাঁর নেতৃত্ব, বিচারব্যবস্থায় পরিবর্তনের উদ্যোগ, দুর্নীতির মামলা এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সরকারের নীতি নিয়ে দেশটির ভেতরে বিতর্ক রয়েছে। নেতানিয়াহু তাঁর বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানের ঘটনায় নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও রয়েছে। এসব বিষয় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে ঘিরে বিতর্ক আরও বাড়িয়েছে।

নির্বাচনের ফল গাজার বাসিন্দাদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বাস্তুচ্যুত গাজাবাসী হুদা আল-হুলি এএফপিকে বলেছেন, নতুন নির্বাচনের ফলাফলে আরও কঠোর ও সহিংস নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে, ইসরাইলের নির্বাচনে কোনো পক্ষের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়া দেশটিকে দীর্ঘ আলোচনার মুখে ফেলেছে। এখন প্রেসিডেন্ট হারজগের সিদ্ধান্ত, আরব দলগুলোর অবস্থান এবং বিরোধী শিবিরের অভ্যন্তরীণ সমঝোতার ওপর নির্ভর করছে পরবর্তী সরকার গঠনের পথ। আলোচনা ব্যর্থ হলে নতুন নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না

Leave a Comment