যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে কানাডা-ইইউর নতুন জোটের উদ্যোগ

মন্ট্রিল সম্মেলনে কানাডা-ইইউ সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ, আলোচনায় নতুন অংশীদারত্ব

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত নির্ভরতা কমিয়ে নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চায় কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এ লক্ষ্য সামনে রেখে কানাডার মন্ট্রিলে ২৯ ও ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুই পক্ষের ২১তম শীর্ষ সম্মেলন। বাণিজ্য, জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), প্রতিরক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও শিক্ষা খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি সম্পর্ককে আরও গভীর করার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে কানাডাকে ইইউর ‘সহযোগী সদস্য’ করার প্রস্তাব নিয়ে জোটের সদস্যদেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির নেতৃত্বে এই উদ্যোগ দুই পক্ষের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের নতুন দিক নির্ধারণ করতে পারে। ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তাও সম্মেলনে ইইউর প্রতিনিধিত্ব করছেন। ইউরোপীয় কাউন্সিলের আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, এবারের সম্মেলনের অন্যতম লক্ষ্য অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার এবং অভিন্ন স্বার্থে সহযোগিতা সম্প্রসারণ।

কেন ঘনিষ্ঠ হচ্ছে কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং কানাডার সঙ্গে ওয়াশিংটনের টানাপোড়েন অটোয়াকে বিকল্প বাণিজ্যিক অংশীদার খুঁজতে উৎসাহিত করছে। কানাডার অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে বাণিজ্য ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একক দেশের ওপর নির্ভরতা কমানো দেশটির সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।

প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি মনে করেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই বেশি অনিশ্চিত ও বিভক্ত হয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে কানাডা ও ইউরোপীয় দেশগুলোর পারস্পরিক সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে একটি শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়ে তোলা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়নও নির্ভরযোগ্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে আগ্রহী। কানাডার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা সেই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

‘সহযোগী সদস্য’ প্রস্তাবে মতপার্থক্য

গত সেপ্টেম্বরে ফন ডার লিয়েন কানাডাকে ২৭ সদস্যের ইইউর প্রথম ‘সহযোগী সদস্য’ করার সম্ভাবনা সামনে আনেন। প্রস্তাবটির উদ্দেশ্য ছিল পূর্ণ সদস্যপদ ছাড়াই কানাডাকে ইউরোপীয় জোটের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করা।

তবে ইইউর বিদ্যমান চুক্তিতে ‘সহযোগী সদস্য’ নামে কোনো স্বীকৃত মর্যাদা নেই। এ কারণে জার্মানিসহ কয়েকটি সদস্যদেশ প্রস্তাবটির বিরোধিতা করে। শেষ পর্যন্ত সম্মেলনের যৌথ ঘোষণার খসড়া থেকে এই নির্দিষ্ট পরিভাষা বাদ দেওয়া হয়।

২৯ অক্টোবর মন্ট্রিলে বক্তব্য দিতে গিয়ে ফন ডার লিয়েন বলেন, তাঁদের লক্ষ্য পূর্ণ সদস্যপদ ছাড়াই এমন একটি সম্পর্ক তৈরি করা, যা আগের যেকোনো অ-ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে ইইউর অংশীদারত্বের তুলনায় আরও ঘনিষ্ঠ হবে। এআই, জলবায়ু, জ্বালানি ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগও তুলে ধরেন তিনি।

অন্যদিকে, কার্নি জানিয়েছেন, সম্পর্কের নাম কী হবে, তার চেয়ে কানাডার নাগরিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তবে কী সুবিধা পাবে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দুই পক্ষের মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের কাঠামো নির্ধারণে আগামী এক বছর আলোচনা চলার কথা রয়েছে।

বাণিজ্য, জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজে সম্ভাবনা

কানাডা ও ইইউর মধ্যে ইতোমধ্যে একটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি কার্যকর রয়েছে। নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কানাডায় ব্যাটারি, বায়ুকল ও অন্যান্য সবুজ প্রযুক্তি তৈরিতে প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে। এসব খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করা ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে কানাডার খনিজ উত্তোলন ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো খাতে ইউরোপীয় বিনিয়োগের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।

এ ছাড়া ডিজিটাল বাণিজ্য, এআই অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত বিধিবিধানের সমন্বয় এবং জ্বালানি খাতে অংশীদারত্ব জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে। তরুণদের কাজ ও শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো এবং গবেষণায় সহযোগিতা সম্প্রসারণও সম্মেলনের আলোচ্য বিষয়।

আগামী দিনের সম্পর্ক কোন পথে?

ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রকাশিত কর্মসূচিতে বাণিজ্য, ডিজিটাল প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। দুই পক্ষের লক্ষ্য একটি ‘ভবিষ্যতের জন্য জোট’ গড়ে তোলা, যার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা বাড়ানো সম্ভব হবে।

তবে সহযোগিতার ঘোষণা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে আলোচনার ফলাফল, বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ চুক্তির ওপর। বিশেষ করে ‘সহযোগী সদস্য’ মর্যাদা নিয়ে মতবিরোধের পরিবর্তে বাস্তব সুবিধাভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলাই এখন কানাডা ও ইইউর সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ।

 

সূত্র বাসস নিউজ

Leave a Comment