একসময় সংসারের অভাব-অনটন সামলাতে হিমশিম খেতে হতো। সেই পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে কৃষিকাজকে বেছে নেন রংপুরের পীরগাছা উপজেলার নারী উদ্যোক্তা সেলিনা আক্তার। বাড়ির পাশের মাত্র এক একর জমিতে বিভিন্ন জাতের শাক-সবজি চাষ করে এখন প্রতি মাসে খরচ বাদে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় করছেন তিনি। তাঁর এই উদ্যোগে নিজের পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার পাশাপাশি কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থানও হয়েছে।
এক একর জমিতে নানা জাতের সবজি চাষ
রংপুরের পীরগাছা উপজেলার কান্দী ইউনিয়নের কান্দী কাবিলাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সেলিনা আক্তার। বাড়ির পাশের এক একর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে সবজি চাষ শুরু করেন তিনি। শীত ও গ্রীষ্ম—দুই মৌসুমেই বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন করেন এই উদ্যোক্তা।
তাঁর জমিতে লাউ, মিষ্টিকুমড়া, বেগুন, করলা, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শসা, শিমসহ নানা ধরনের শাক-সবজি চাষ হচ্ছে। উৎপাদিত সবজির মান ভালো হওয়ায় স্থানীয় বাজারে এসব পণ্যের চাহিদাও রয়েছে। অনেক পাইকার সরাসরি ক্ষেত থেকে সবজি কিনে নিয়ে যান। এতে পরিবহন খরচ ও বাজারজাতকরণের ঝামেলা কমছে।
প্রতি মাসে আয় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা
সেলিনা আক্তার বাসসকে জানান, কৃষিকাজের শুরুতে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। তবে পরিশ্রম ও নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সফলতা পেয়েছেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকার সবজি বিক্রি হয়। উৎপাদন ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে তাঁর হাতে থাকে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। এই আয় দিয়ে সংসারের ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি অনার্সে পড়ুয়া একমাত্র ছেলের পড়াশোনার খরচও চালাচ্ছেন তিনি।
সেলিনার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে স্থানীয় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী সবজি বিক্রি করা হয়। এরপর অবশিষ্ট উৎপাদন আড়তে সরবরাহ করা হয়। এতে নিয়মিত আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে কয়েকজন শ্রমিকের
সেলিনার সবজি খামারে প্রতিদিন গড়ে চার থেকে ছয়জন শ্রমিক কাজ করেন। নারী ও পুরুষ উভয়েই তাঁর কৃষি উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ফলে নিজের আয়ের পাশাপাশি স্থানীয় কয়েকজন মানুষের কাজের সুযোগও তৈরি করেছেন তিনি।
বাড়ির কাছেই জমি হওয়ায় নিয়মিত ক্ষেতের পরিচর্যা করতে পারেন সেলিনা। জমিতে সারি সারি মাচায় বিভিন্ন সবজির গাছ বেড়ে উঠছে। উৎপাদন ও পরিচর্যার কাজেও সরাসরি সময় দিচ্ছেন এই নারী উদ্যোক্তা।
জৈব সার ব্যবহারে গুরুত্ব
সবজি উৎপাদনে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সার ও ভার্মিকম্পোস্ট ব্যবহার করছেন সেলিনা আক্তার। তাঁর দাবি, এতে উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি ফসলের ফলনও ভালো হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে তিনি বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনের চেষ্টা করছেন।
সেলিনার উদ্যোগকে দেখছেন অনুপ্রেরণা হিসেবে
স্থানীয় একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক আমিনুল ইসলাম বলেন, নিজের উদ্যোগে সবজি চাষ করে সেলিনা আক্তার আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠেছেন। তাঁর মতে, সময়মতো কৃষি পরামর্শ, উন্নত জাতের বীজ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারজাতকরণে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে এ ধরনের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষি উদ্যোক্তারা আরও এগিয়ে যেতে পারবেন।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বাসসকে বলেন, গ্রামীণ এলাকায় নারীদের কৃষিকাজে অংশগ্রহণ এখনো অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। এমন পরিস্থিতিতে এক একর জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করে সেলিনার এগিয়ে যাওয়া অন্য নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে। তাঁর উদ্যোগে আয় সৃষ্টি, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় বাজারে সবজি সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমিন জানান, সেলিনার মতো আগ্রহী নারী কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, এ ধরনের উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি বেকার যুবক ও নারীদের কৃষিকাজে উৎসাহিত করতে পারে।
সীমিত জমিতে পরিকল্পিতভাবে সবজি চাষ করে সেলিনা আক্তার যে আয়ের পথ তৈরি করেছেন, তা স্থানীয় পর্যায়ে নারী উদ্যোক্তা ও কৃষিভিত্তিক কর্মসংস্থানের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
