পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার পাল্টাপাল্টি ভেটো, সংকটে জাতিসংঘ মিশন ভূমিকা নিউজ

যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার ভেটোতে পশ্চিম সাহারায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন নিয়ে অনিশ্চয়তা

পশ্চিম সাহারায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মিশনের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পাল্টাপাল্টি প্রস্তাবে একে অপরের ভেটো দেওয়ায় শনিবার (৩১ অক্টোবর) এর বর্তমান মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলা পশ্চিম সাহারা সংকট নিরসনে জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়েও নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের এই শান্তিরক্ষা মিশনটি মিনুরসো (MINURSO) নামে পরিচিত। মিশনটির মূল দায়িত্বের মধ্যে পশ্চিম সাহারার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গণভোট আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া ছিল। তবে কয়েক দশক পার হলেও সেই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়নি। মিশনের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এতে ৩৫৯ জন বেসামরিক ও সামরিক সদস্য দায়িত্ব পালন করছিলেন। জাতিসংঘ সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

পশ্চিম সাহারা নিয়ে প্রায় পাঁচ দশক ধরে মরক্কো এবং আলজেরিয়ার সমর্থনপুষ্ট পলিসারিও ফ্রন্টের মধ্যে বিরোধ চলছে। মরক্কো অঞ্চলটির ওপর নিজের সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে পলিসারিও ফ্রন্ট পশ্চিম সাহারার জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছে।

এই পরিস্থিতিতে শান্তিরক্ষা মিশনের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে ১১টি দেশ প্রস্তাবটির পক্ষে অবস্থান নেয়। এতে পশ্চিম সাহারা সংকটের সমাধানে মরক্কোর স্বায়ত্তশাসন পরিকল্পনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

মার্কিন প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে মিশনের নাম পরিবর্তন করে ‘মিনুসো’ করার পরিকল্পনাও ছিল। একই সঙ্গে পশ্চিম সাহারার জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নির্ধারণে গণভোট আয়োজনের বিষয়টি প্রস্তাব থেকে বাদ পড়ত।

তবে শুক্রবার রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের খসড়া প্রস্তাবে ভেটো দেয়। মস্কোর অভিযোগ, প্রস্তাবটি একতরফাভাবে তৈরি করা হয়েছে। এর পরিবর্তে রাশিয়া আগের শর্ত ও কাঠামো বজায় রেখে শান্তিরক্ষা মিশনের মেয়াদ বাড়ানোর একটি পাল্টা প্রস্তাব উত্থাপন করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রও সেই প্রস্তাবে ভেটো দেয়। ফলে কোনো প্রস্তাবই পাস হয়নি। মার্কিন প্রস্তাবের পক্ষে থাকা কয়েকটি দেশ রাশিয়ার প্রস্তাবে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে।

জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের কয়েকটি দেশ তাদের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে গণভোটের ধারণা এবং মিশনের পুরোনো নাম ধরে রাখতে চেয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জাতিসংঘ কয়েক দশক ধরে গণভোট আয়োজনের প্রস্তুতি নিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

অন্যদিকে ফ্রান্সের প্রতিনিধি জেরোম বনাফোঁ রাশিয়ার অবস্থানের সমালোচনা করে একে বাধা সৃষ্টির পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত সারাহ ম্যাকিনটোশও যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন না দেওয়া দেশগুলোর প্রতি ওই খসড়ার ভিত্তিতে সমাধান খোঁজার আহ্বান জানান।

মরক্কোর রাজকীয় দপ্তর শুক্রবার মিশনের মেয়াদ না বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, এর মাধ্যমে পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদের সম্পৃক্ততার অবসান হওয়া এবং বিষয়টি পরিষদের আলোচ্যসূচি থেকে বাদ দেওয়া উচিত।

তবে আলজেরিয়া এ অবস্থানের বিরোধিতা করেছে। জাতিসংঘে দেশটির প্রতিনিধি আমার বেনজামা রাশিয়া এবং অন্য যেসব দেশ ‘স্পষ্ট অবিচারের’ সঙ্গে যুক্ত হতে চায়নি, তাদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, সাহরাউই জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিশ্চিত করে এমন সমাধানের পক্ষে আলজেরিয়া কাজ চালিয়ে যাবে। সাহরাউইরা পশ্চিম সাহারার আদিবাসী জনগোষ্ঠী।

নিউইয়র্কে পলিসারিও ফ্রন্টের প্রতিনিধি সিদি ওমরও যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব আটকে যাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

উল্লেখ্য, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ পশ্চিম সাহারা সংকট সমাধানে মরক্কোর স্বায়ত্তশাসন পরিকল্পনার প্রতি উল্লেখযোগ্য সমর্থন জানায়। আলজেরিয়ার আপত্তি সত্ত্বেও পরিকল্পনাটিকে সম্ভাব্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০০৭ সালে মরক্কোর পক্ষ থেকে উত্থাপিত ওই পরিকল্পনায় পশ্চিম সাহারার ওপর মরক্কোর সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে অঞ্চলটিকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

এদিকে পাল্টাপাল্টি ভেটোর কারণে শান্তিরক্ষা মিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার মুখে পড়ায় পশ্চিম সাহারার দীর্ঘদিনের বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।