ট্রাম্পের বিজয় তোরণ নির্মাণে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র যুক্তি নিয়ে মার্কিন বিচারকের প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পিত বিশাল বিজয় তোরণ নির্মাণের পক্ষে সরকারের দেওয়া ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দেশটির এক ফেডারেল বিচারক। প্রকল্পটির সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার সম্পর্ক কী, তা সরকারের আইনজীবীদের কাছে জানতে চেয়েছেন তিনি।
শুক্রবার অনুষ্ঠিত শুনানিতে জেলা আদালতের বিচারক তানিয়া চুটকান বলেন, প্রকল্পটির পক্ষে সরকার আগে কখনো জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেনি। এবারই প্রথম এ ধরনের ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওয়াশিংটনে ২৫০ ফুট বা প্রায় ৭৬ মিটার উঁচু একটি সাদা রঙের বিজয় তোরণ নির্মাণ করা হবে। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের বিখ্যাত ‘আর্ক দ্য ত্রিয়ম্ফ’-এর আদলে স্থাপনাটি তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রকল্পটি প্রথম ঘোষণার সময় ট্রাম্প জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি উল্লেখ করেননি। তবে পরবর্তী সময়ে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, প্রস্তাবিত তোরণে অত্যাধুনিক সামরিক স্থাপনা রাখা হবে। সেখানে ড্রোন এবং স্নাইপার সদস্য মোতায়েনের ব্যবস্থাও থাকতে পারে বলে জানান তিনি।
শুনানিতে বিচারক চুটকান বলেন, হোয়াইট হাউসে বড় আকারের বলরুম নির্মাণের পক্ষে যুক্তি দেওয়ার সময়ও ট্রাম্প প্রশাসন সুপ্রিম কোর্টে জাতীয় নিরাপত্তার প্রসঙ্গ তুলেছিল। তবে কোনো প্রকল্পের পক্ষে শুধু জাতীয় নিরাপত্তার কথা বললেই সেই যুক্তি গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় মার্কিন বিচার বিভাগের আইনজীবী রবার্ট স্ট্যান্ডার বলেন, বিজয় তোরণ নির্মাণ প্রকল্পটি বর্তমান প্রশাসনের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত।
নির্মাণ বন্ধে আদালতে মামলা
প্রস্তাবিত তোরণ নির্মাণ বন্ধের দাবিতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশ নেওয়া একদল সাবেক মার্কিন সেনাসদস্য। তাঁদের আশঙ্কা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা ও স্মৃতিসৌধের দৃশ্যমান সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আগামী সপ্তাহের শুরুতেই নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন মামলাকারীরা।
তাঁদের আইনজীবী ওয়েন্ডি লিউ আদালতে বলেন, প্রস্তাবিত তোরণটি এতটাই বিশাল হবে যে লিংকন মেমোরিয়াল ও আর্লিংটন ন্যাশনাল সিমেট্রির মধ্যকার দৃশ্যমান সংযোগ আড়াল হয়ে যেতে পারে।
লিংকন মেমোরিয়াল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা। অন্যদিকে আর্লিংটন ন্যাশনাল সিমেট্রিতে দেশটির বহু সামরিক সদস্যকে সমাহিত করা হয়েছে। মামলাকারীদের মতে, এই দুই স্থাপনার মধ্যকার দৃশ্যমান সম্পর্কের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে তোরণ নির্মাণের পরিকল্পনা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
শুক্রবারের শুনানিতে বিচারক চুটকান মামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি। তবে দ্রুত এ বিষয়ে রায় ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ওয়াশিংটনে একের পর এক বড় প্রকল্প
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীতে নিজের পরিকল্পনা ও স্থাপত্যিক ছাপ রাখতে ট্রাম্প প্রশাসন বেশ কয়েকটি বড় উন্নয়ন ও সংস্কার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বিজয় তোরণ নির্মাণের পরিকল্পনাও এর অংশ।
এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে হোয়াইট হাউসে বিশাল বলরুম নির্মাণ। এর জন্য প্রেসিডেন্টের বাসভবনের একটি অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া ন্যাশনাল মলের দীর্ঘ জলাধার ‘রিফ্লেক্টিং পুল’ সংস্কারের কাজ চলছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে জলাধারটির কাঠামো ও চেহারায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
ঐতিহাসিক ওয়াটারফ্রন্ট গলফ কোর্স ‘ইস্ট পোটোম্যাক গলফ লিংকস’ আধুনিকায়নের প্রস্তাবও দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে এ প্রকল্প নিয়েও আইনি বিরোধ তৈরি হয়েছে। শুক্রবার এ মামলার দায়িত্বে থাকা বিচারক তদন্ত শুরু করেছেন। প্রশাসনের আইনজীবীরা আদালতে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
এদিকে প্রয়াত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির নামে প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক ও শিল্পকলা কেন্দ্র ‘কেনেডি সেন্টার’-এর দেয়ালে একসময় ট্রাম্পের নাম যুক্ত করা হয়েছিল। তবে আদালতের নির্দেশে পরে সেই নাম সরিয়ে ফেলা হয়।
বিজয় তোরণ নির্মাণ নিয়ে চলমান মামলায় বিচারকের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত যুক্তি এবং ঐতিহাসিক স্থাপনার ওপর প্রকল্পটির সম্ভাব্য প্রভাব—দুই বিষয়ই এ বিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
