বিচারপতি অপসারণ নিয়ে পোল্যান্ডে রাজনৈতিক উত্তেজনা, ওয়ারশতে বিক্ষোভ

পোল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালতের প্রধান বিচারপতি বোগদান সুইয়েজকোভস্কিকে সাময়িক বরখাস্ত করাকে কেন্দ্র করে দেশটিতে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনায় ক্ষমতাসীন মধ্যপন্থী সরকার ও জাতীয়তাবাদী ডানপন্থী বিরোধীদের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাজধানী ওয়ারশতে সাংবিধানিক আদালতের সামনে দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) আদালতের সামনে বিক্ষোভ করেন বিরোধী দল ল অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির (পিআইএস) সমর্থকেরা। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

আদালতের সামনে বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার তিন

প্রধান বিচারপতি সুইয়েজকোভস্কিকে দায়িত্ব থেকে সাময়িক বরখাস্তের প্রতিবাদে আদালতের সামনে জড়ো হন পিআইএসের সমর্থকেরা। আদালতের প্রবেশপথে কয়েক ডজন পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়।

এ সময় বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কের বিরুদ্ধে ‘টাস্ক বিশ্বাসঘাতক’ স্লোগান দেন। একপর্যায়ে কয়েকজন নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে আদালত চত্বরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। পুলিশ জানিয়েছে, আদালত ভবন এলাকায় ঢোকার চেষ্টা করায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া টমাস জালেস্কি এএফপিকে বলেন, ‘টাস্ক আমাদের সাংবিধানিক অধিকার পদদলিত করছেন।’

অন্যদিকে, আদালতের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স অ্যাকাউন্টে এ ঘটনাকে ‘অভ্যুত্থান’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

মাঝ আকাশ থেকে ওয়ারশতে ফিরলেন প্রেসিডেন্ট

পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় আফ্রিকা সফর বাতিল করে মাঝ আকাশ থেকেই রাজধানী ওয়ারশতে ফিরে আসেন পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকি। তিনি তখন সেনেগালের উদ্দেশে সরকারি সফরে যাচ্ছিলেন।

পোল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিআইএস নেতা ইয়ারোস্লাভ কাচিনস্কি বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দিয়ে প্রেসিডেন্টকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। এরপর প্রেসিডেন্ট জানান, তিনি সফর বাতিল করে বিমানকে ওয়ারশতে ফেরার নির্দেশ দিয়েছেন।

রাজধানীতে ফিরে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া আদালতপ্রধান সুইয়েজকোভস্কি এবং আদালতের প্রথম প্রধান বিচারপতি জবিগনিয়েভ কাপিনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।

প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফ পাওয়েল শেফেরনাকা শনিবার (৩১ অক্টোবর) ভোরে জানান, পরে নাওরোকি কাপিনস্কিকে সঙ্গে নিয়ে সাংবিধানিক আদালত ভবনে প্রবেশ করেন। স্থানীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, ভবনে ঢোকার সময় তাঁকে ভিড় ঠেলে সামনে এগোতে হয়।

বিচারকদের নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ

প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কের সরকার কয়েক সপ্তাহ ধরে সাংবিধানিক আদালতের বিচারকদের সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে। এসব বিচারক ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা পিআইএস সরকারের আমলে নিয়োগ পেয়েছিলেন।

ওই সময়ে সাংবিধানিক আদালত বিভিন্ন রায়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আইনের তুলনায় পোল্যান্ডের জাতীয় আইনকে প্রাধান্য দেয়। এর ফলে আদালতটি তৎকালীন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করে আসছিল ইইউ।

২০২৩ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নপন্থী নেতা হিসেবে পরিচিত টাস্ক ব্রাসেলসের সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে ডানপন্থী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নাওরোকি সাংবিধানিক আদালতে টাস্ক সরকারের মনোনীত বিচারকদের নিয়োগ আটকে দিয়েছেন।

আদালতের নেতৃত্ব নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

বিচারপতি আন্না করভিন-পিওত্রোভস্কি প্রধান বিচারপতি সুইয়েজকোভস্কিকে সাময়িক বরখাস্তের ঘোষণা দেন। তাঁর দাবি, আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বার্থেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এদিকে, বিচারমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেল ওয়ালদেমার জুরেক সাংবাদিকদের জানান, তিনি সুইয়েজকোভস্কি ও তাঁর ডেপুটি বার্তলোমেই সোখানস্কির আইনি দায়মুক্তি প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন।

জুরেক বলেন, ‘এই আদালত যেন ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। আমাদের এর স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে হবে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে প্রধানমন্ত্রী টাস্ক তাঁর সরকারের পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সরকারের দায়িত্ব।

টাস্ক আরও বলেন, পিআইএস সরকারের দীর্ঘদিনের আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের পর এ প্রক্রিয়া কঠিন এবং কখনো কখনো বেদনাদায়ক। এ জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই।

আদালতের ওয়েবসাইট বন্ধ, পদে থাকার দাবি সুইয়েজকোভস্কির

শুক্রবার সন্ধ্যায় সাংবিধানিক আদালতের আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা যাচ্ছিল না। অন্যদিকে, আদালতের এক্স অ্যাকাউন্টে আবারও ঘটনাটিকে ‘অভ্যুত্থান’ বলে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে দাবি করা হয়, সুইয়েজকোভস্কি এখনো তাঁর পদে বহাল রয়েছেন।

ওই অ্যাকাউন্টে আরও বলা হয়, করভিন-পিওত্রোভস্কি অন্তর্বর্তী প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নিতে পারেন না, কারণ প্রেসিডেন্ট তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করাননি।

তবে করভিন-পিওত্রোভস্কি তাঁর অবস্থানের পক্ষে বলেন, আধুনিক ইউরোপে সাংবিধানিক আদালত ছাড়া কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চলতে পারে না। নাগরিকদের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষায় এমন আদালত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

Leave a Comment