কিউবার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার নিন্দায় জাতিসংঘে ১৩০ দেশের ভোট
কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও আর্থিক অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে আবারও প্রস্তাব পাস করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। বুধবার (২৮ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে ১৩০টি দেশ। বিপক্ষে ছিল ১৭টি দেশ এবং ভোটদানে বিরত ছিল ২৫টি দেশ। ১৯৯২ সাল থেকে এ বিষয়ে জাতিসংঘে ধারাবাহিকভাবে প্রস্তাব গৃহীত হয়ে আসছে। তবে এবার প্রস্তাবটির পক্ষে সমর্থন গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
নিউইয়র্কে দুই দিনব্যাপী বিতর্কের পর প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৯৬ সালের হেলমস-বার্টন আইনসহ এমন বিধিবিধান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যেগুলোর প্রভাব অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বৈধ স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নৌ চলাচলের স্বাধীনতার ওপর পড়তে পারে।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান
জাতিসংঘের প্রস্তাবে সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে অন্য দেশের ওপর বহির্দেশীয় প্রভাব বিস্তারকারী এ ধরনের আইন ও পদক্ষেপ গ্রহণ এবং প্রয়োগ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে যেসব দেশ এমন বিধিনিষেধ চালু রেখেছে, তাদের সেগুলো বাতিল বা অকার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
তবে সাধারণ পরিষদের এ ধরনের প্রস্তাব রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাধ্যতামূলক নয়। মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের জন্য দেশটির কংগ্রেসের পদক্ষেপ প্রয়োজন। ফলে জাতিসংঘে প্রস্তাব পাস হলেও অবরোধ অবসানের বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত।
গত বছরের তুলনায় সমর্থন কমেছে
এবারের ভোটের ফলাফল আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৫ সালে একই ধরনের প্রস্তাবের পক্ষে ১৬৫টি দেশ ভোট দিয়েছিল। বিপক্ষে ছিল সাতটি দেশ এবং ভোটদানে বিরত ছিল ১২টি দেশ। এবার সমর্থন কমে ১৩০টিতে নেমেছে, বিপক্ষে ভোট বেড়ে হয়েছে ১৭টি এবং বিরত থেকেছে ২৫টি দেশ। >
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতার পর কয়েকটি দেশ তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে। জার্মানি ও ইতালির মতো কিছু ইউরোপীয় দেশ এবার ভোটদানে বিরত ছিল। ফলে প্রস্তাবটি পাস হলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধবিরোধী অবস্থানের সমর্থনে আগের তুলনায় ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে।
বিতর্কে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার প্রতিনিধিদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়
প্রস্তাব নিয়ে বিতর্কের সময় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার প্রতিনিধিদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। মার্কিন প্রতিনিধি মাইক ওয়াল্টজ কিউবার সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বক্তব্য দেওয়ার সময় কিউবার প্রতিনিধিদলের সদস্যরা আপত্তি জানান।
একপর্যায়ে কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ ও মার্কিন প্রতিনিধিদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সাধারণ পরিষদের সভাপতি কিছু সময়ের জন্য অধিবেশন স্থগিত করেন। পরে আবার আলোচনা শুরু হয়।
কিউবার পক্ষ থেকে অবরোধকে দেশটির অর্থনীতি ও জনগণের জীবনযাত্রার ওপর চাপ সৃষ্টিকারী পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা কিউবার সরকারের শাসনব্যবস্থা ও কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা করেন। দুই দেশের দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ক এই বিতর্কেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অর্থনীতি ও জনজীবনে অবরোধের প্রভাব
বিতর্কে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক জোটের প্রতিনিধিরা কিউবার অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানান। দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের পক্ষে সিঙ্গাপুরের প্রতিনিধি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের ঘাটতি এবং খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন।
জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের পক্ষে উগান্ডার প্রতিনিধি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পানি সরবরাহ ও খাদ্য সংরক্ষণব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। তিনি অবরোধকে সমষ্টিগত শাস্তির সঙ্গে তুলনা করে তা প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।
ইরিত্রিয়ার প্রতিনিধি অবরোধকে আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে সমালোচনা করেন। অন্যদিকে জি-৭৭ ও চীনের পক্ষে উরুগুয়ের প্রতিনিধি বলেন, কিউবার সঙ্গে তৃতীয় দেশগুলোর বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও আর্থিক লেনদেনে বিধিনিষেধ দেশটির টেকসই উন্নয়নের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
ছয় দশকের বেশি সময় ধরে অবরোধ
কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ১৯৬০ সালে শুরু হয়। ১৯৬২ সালে তা পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও আর্থিক অবরোধে রূপ নেয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আইন ও বিধিনিষেধের মাধ্যমে এর পরিধি বাড়ানো হয়। ১৯৯৬ সালের হেলমস-বার্টন আইন বিদেশি কোম্পানিগুলোর ওপরও অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান প্রশাসন কিউবার ওপর চাপ বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করছে। এ অবস্থায় জাতিসংঘের সর্বশেষ ভোট কিউবা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মতপার্থক্য এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে হাভানার চলমান বিরোধকে আবারও সামনে এনেছে। তবে অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তন আসবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
