একসময় ট্রাম্পের প্রচারক, এখন তাঁর বিরোধী—কেন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ল্যাটিনো ভোটাররা?

ট্রাম্পের ওপর ক্ষুব্ধ অ্যারিজোনার ল্যাটিনো ভোটাররা, ‘আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন’

একসময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারে সক্রিয় ছিলেন ফার্নান্দো নুনেজ। প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের কাছে ট্রাম্পের পক্ষে সমর্থন চেয়েছিলেন তিনি। অ্যারিজোনায় ট্রাম্পের জয় এবং হোয়াইট হাউসে তাঁর প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে কাজ করা সেই তরুণ এখন নিজেই সাবেক সমর্থকের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। আসন্ন নির্বাচনে ট্রাম্প-সমর্থিত রিপাবলিকান প্রার্থীদের ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

২২ বছর বয়সী নুনেজের পরিবারের শিকড় মেক্সিকোতে। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি ক্ষোভ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তিনি পুরোপুরি উল্টো পথে হাঁটছেন।’ বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের হতাশার কথা তুলে ধরেন তিনি।

নুনেজ একসময় ট্রাম্পের কয়েকটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে আশাবাদী হয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানো, আন্তর্জাতিক যুদ্ধ বন্ধ করা এবং জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত তদন্তের সব নথি প্রকাশ করা। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর এসব বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা তাঁকে হতাশ করেছে।

বিশেষ করে এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশে স্বচ্ছতার অভাব এবং ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ নিয়ে ক্ষুব্ধ নুনেজ। তাঁর মতে, এই যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে।

পেশায় বিক্রয় প্রতিনিধি নুনেজের মাসিক আয় ১ হাজার ৬০০ ডলার। তিনি বলেন, গ্যাস, বিমা ও খাবারসহ প্রায় সবকিছুর দাম বেড়েছে। আগে কখনো এত বেশি দামে এসব পণ্য ও সেবা কিনতে হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোরও বিরোধিতা করেন তিনি। নুনেজের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধে জড়ানোর কথা ছিল না।

আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে কোনো রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে ভোট দিতে চান না নুনেজ। বরং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্য থেকে কাউকে বেছে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন তিনি।

ল্যাটিনো ভোটারদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা

অ্যারিজোনার ইউমা কাউন্টি যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাটিনো জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ২০২৪ সালের নির্বাচনে এই জনগোষ্ঠীর একটি অংশ রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকেছিল। ওই অঞ্চলে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর তুলনায় বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন ট্রাম্প।

কৃষিপ্রধান শহর সোমারটনে ল্যাটিনো জনগোষ্ঠীর বসবাস প্রায় শতভাগ। ঐতিহ্যগতভাবে শহরটির বাসিন্দাদের বড় অংশ ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করলেও ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রায় ৪০ শতাংশ ভোটার ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন।

শহরটির মেয়র জেরার্ডো আনায়ার মতে, সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে মূল্যস্ফীতি এবং সীমান্ত দিয়ে বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর প্রবেশ নিয়ে মানুষের অসন্তোষ ট্রাম্পের পক্ষে ভোট বাড়িয়েছিল। বামপন্থী হিসেবে পরিচিত এই মেয়র বলেন, সেটি ছিল মূলত বাইডেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ভোট।

তবে মেয়র আনায়ার ধারণা, ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া অনেক মানুষ এখন বাস্তবতা বুঝতে পেরে হতাশ হচ্ছেন। শহরের একমাত্র সুপারমার্কেটের সামনেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম নিয়ে স্থানীয়দের অসন্তোষের কথা শোনা যাচ্ছে।

এএফপির সঙ্গে কথা বলা বাসিন্দারা মেক্সিকান খাবার কারনে আসাদা এবং ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। পেট্রলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মরুভূমিতে অফ-রোড গাড়ি চালানোর মতো জনপ্রিয় বিনোদনও আগের চেয়ে ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।

ট্রাম্প একজন দক্ষ ব্যবসায়ী—এমন ধারণার ওপরও অনেকের আস্থা কমছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাগান পরিচর্যাকারী বলেন, তিনি ভেবেছিলেন ট্রাম্প সবকিছু ঠিক করে দেবেন। কিন্তু এখন তাঁর ওপর আর কোনো আস্থা নেই।

অভিবাসন অভিযান নিয়ে আপত্তি

সীমান্ত দিয়ে অভিবাসীদের প্রবেশের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন অভিযান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ওই বাগান পরিচর্যাকারীর অভিযোগ, এসব অভিযানে এমন অভিবাসীরাও বহিষ্কারের শিকার হচ্ছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ নেই।

তিনি বলেন, ট্রাম্প অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না বলে তাঁর মনে হয়েছে। এ কারণে ট্রাম্পকে বর্ণবাদী বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন জনমত জরিপেও ল্যাটিনো ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এই অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের অন্তত একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আশা করছে ডেমোক্র্যাটরা।

তবে ট্রাম্পের প্রতি ক্ষোভ থাকলেই যে ভোটাররা ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করছেন, এমন নয়। সোমারটনের ওই বাগান পরিচর্যাকারী এবার কাউকেই ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

শহরের সেলুনকর্মী ৫২ বছর বয়সী জাইমে সানচেজও এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি কাকে ভোট দেবেন। শুরুতে গর্ভপাতবিরোধী অবস্থান এবং পারিবারিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকারের কারণে তিনি ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু এখন প্রশাসনের অভিবাসননীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন তিনি।

সানচেজের আশঙ্কা, অপরাধে জড়িত নন এমন প্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীদের বহিষ্কার করা হলে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া তাঁদের সন্তানদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, পরিবার ভেঙে গেলে শিশুদের বেড়ে ওঠা ও নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ধর্মীয় মূল্যবোধে রিপাবলিকানদের প্রতি সমর্থন

অন্যদিকে প্রতিবেশী শহর সান লুইসের ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টান ধর্মযাজক হোসে ম্যানুয়েল কাস্ত্রো ল্যাটিনো ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ দেখলেও দীর্ঘমেয়াদে রিপাবলিকানদের প্রতি তাঁদের সমর্থন বাড়তে পারে বলে মনে করেন।

৭৫ বছর বয়সী এই রক্ষণশীল ধর্মযাজকের মতে, ধর্মীয় বিশ্বাস ও পারিবারিক মূল্যবোধ অনেক ল্যাটিনো ভোটারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে গর্ভপাত এবং ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের অধিকার নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থানের সঙ্গে অনেক ধর্মপ্রাণ ভোটার একমত নন।

কাস্ত্রো বলেন, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কিছু অবস্থান পবিত্র ধর্মগ্রন্থের শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন তাঁর অনুসারীদের অনেকে। তাঁর ধারণা, বর্তমান অসন্তোষের কারণে কেউ কেউ প্রতিবাদী ভোট দিতে পারেন, তবে দীর্ঘমেয়াদে ধর্মপ্রাণ ল্যাটিনোদের একটি অংশ রিপাবলিকানদের প্রতিই ঝুঁকে থাকতে পারে।

সব মিলিয়ে অ্যারিজোনার ইউমা কাউন্টিতে ল্যাটিনো ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি অসন্তোষের চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে। তবে এই ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে যাবে, নাকি ভোটারদের একটি অংশ ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন—তা নির্বাচনের ফলেই বোঝা যাবে।

Leave a Comment