প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনে নতুন অঙ্গীকার প্রায় ২০০ দেশের
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ২০৩০ সালের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতি বাড়াতে নতুন করে অঙ্গীকার করেছে প্রায় ২০০টি দেশ। আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সম্মেলন কপ-১৭-এ টানা দুই সপ্তাহের আলোচনার পর শুক্রবার গুরুত্বপূর্ণ দুটি নথিতে সমঝোতায় পৌঁছান প্রতিনিধিরা। তবে কিছু বিষয়ে ঐকমত্য হলেও প্রকৃতির ক্ষতি বন্ধে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে সরকারি ভর্তুকি বন্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও আলোচনা চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত দুটি নথি অনুমোদনের ঘোষণা এলে সম্মেলনস্থলে প্রতিনিধিরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তবে অর্জিত অগ্রগতি নিয়ে সন্তুষ্টির পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার হতাশাও ছিল।
কপ-১৭ সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃতির ধ্বংস বন্ধ করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনের উদ্যোগকে আরও গতিশীল করা। বৈশ্বিক পর্যায়ে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অগ্রগতি পিছিয়ে থাকায় সম্মেলনটি নতুন করে দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি ও কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেয়।
জাতিসংঘের নির্ধারিত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর স্থলভাগ ও সমুদ্রের অন্তত ৩০ শতাংশ সংরক্ষিত এলাকার আওতায় আনা। পাশাপাশি দূষণ কমানো, আগ্রাসী প্রজাতির বিস্তার নিয়ন্ত্রণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অর্থায়ন বাড়ানোর বিষয়ও রয়েছে। এসব লক্ষ্য অর্জনে বর্তমান অগ্রগতি যথেষ্ট নয় বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।
সম্মেলনের সভাপতি হাম্বারৎসুম মাতেভোসিয়ান দুটি গুরুত্বপূর্ণ নথিতে হাতুড়ি ঠুকে অনুমোদনের ঘোষণা দেন। তবে শনিবার ভোর পর্যন্ত নথিগুলোর চূড়ান্ত সংস্করণ পাওয়া যায়নি।
ফ্রান্সের পরিবেশগত রূপান্তরবিষয়ক মন্ত্রী মনিক বারবু সম্মেলনের ফলাফলকে প্রকৃতির বর্তমান সংকটের তুলনায় অপর্যাপ্ত বলে মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, জীববৈচিত্র্য হ্রাস ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সম্মেলনে একাধিক সুযোগ কাজে লাগানো যায়নি। তিনি বলেন, আলোচনার গতি বাড়ানোর অপেক্ষায় প্রকৃতি বসে থাকবে না।
কিছু অগ্রগতি, রয়ে গেছে দুর্বলতা
শুক্রবার রাত পেরিয়ে শনিবার সকাল পর্যন্ত সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশন চলে। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে কারিগরি ও নীতিগত বিষয়ে দীর্ঘ বিতর্ক হয়। কয়েকজন প্রতিনিধি ফ্লাইট ধরতে সম্মেলনস্থল ছেড়ে গেলেও অন্যরা আলোচনা অব্যাহত রাখেন।
আইডিডিআরআই থিংকট্যাংকের কপ পর্যবেক্ষক জুলিয়েট ল্যান্ড্রি এএফপিকে বলেন, পুরো সম্মেলনজুড়েই বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে টানাপোড়েন ছিল। এমন পরিস্থিতিতে সব বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
অনুমোদিত নথির একটি খসড়ায় দেশগুলোকে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নিজেদের প্রচেষ্টা ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকৃতির ক্ষতির জন্য দায়ী কারণগুলো মোকাবিলায় আরও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
ডব্লিউডব্লিউএফ ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধি গুইদো ব্রুকহোভেনের মতে, কিছু দুর্বলতা থাকলেও সম্মেলনের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর ভর্তুকির বিষয়ে আরও কার্যকর সিদ্ধান্ত না আসাকে তিনি সীমাবদ্ধতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার, নিবিড় কৃষি এবং অতিরিক্ত মাছ আহরণের মতো পরিবেশের ক্ষতি করে এমন কর্মকাণ্ডে সরকারি ভর্তুকি ও অন্যান্য আর্থিক প্রণোদনা বন্ধের বিষয়টি সম্মেলনের অন্যতম বিতর্কিত আলোচ্য ছিল। গ্রিনপিস ইন্টারন্যাশনালের আন ল্যামব্রেখটস বলেন, সিদ্ধান্তের ভাষা তুলনামূলক দুর্বল হলেও ক্ষতিকর আর্থিক প্রণোদনা নিয়ে আলোচনায় রাজনৈতিক গতি তৈরি হয়েছে।
বৈজ্ঞানিক তথ্য ও অর্থায়ন নিয়ে মতবিরোধ
সম্মেলনে বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন অনুমোদন নিয়েও বিরল বিরোধ দেখা দেয়। কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন অনুমোদনের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ ওঠে।
কয়েক ডজন দেশের পক্ষে দেওয়া বক্তব্যে সুইজারল্যান্ডের আলোচক গ্যাব্রিয়েলা ব্ল্যাটার বলেন, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এবং নীতিনির্ধারণে এর ব্যবহার রাজনৈতিক কারণে প্রশ্নবিদ্ধ বা সীমিত করার প্রবণতা নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন। তাঁর মতে, জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অধিকার থাকলেও বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আপস করা উচিত নয়।
এদিকে প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য অর্থের নতুন উৎস খুঁজে বের করা নিয়েও মতবিরোধ তৈরি হয়। জ্বালানি সংকট এবং ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বিভিন্ন দেশের সরকারি বাজেটে চাপ থাকায় বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীনসহ তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোকে বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অর্থায়নে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানায়। শুক্রবার প্রকাশিত একটি খসড়া নথিতে উন্নত দেশগুলোর দাতা গোষ্ঠীর বাইরে থাকা দেশগুলোকে স্বেচ্ছায় সেই গোষ্ঠীতে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
তবে করপোরেট অনুদান সংগ্রহের লক্ষ্যে জাতিসংঘের উদ্যোগে গঠিত ‘ক্যালি ফান্ড’ নিয়েও অমীমাংসিত বিষয় রয়ে গেছে। কয়েক বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের প্রত্যাশা থাকলেও তহবিলটিতে বর্তমানে অর্থের পরিমাণ প্রায় শূন্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘প্ল্যান্ট-ফর-দ্য-প্ল্যানেট’ সংস্থার প্রতিনিধি পাখি দাস বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো ২০২৮ সালের জন্য পিছিয়ে দেওয়ায় ততদিন পর্যন্ত তহবিলটি কার্যত শূন্য থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে ঘোষণা করা হয়, ২০২৮ সালে পরবর্তী জীববৈচিত্র্য সম্মেলনের আয়োজক হবে ইকুয়েডর। গোপন ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বী পানামাকে পরাজিত করে এ দায়িত্ব পেয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি।
কপ-১৭-এ নতুন অঙ্গীকার ও কিছু সমঝোতা হলেও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্য অর্জন করতে হলে অর্থায়ন, বৈজ্ঞানিক তথ্যের ব্যবহার এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন হবে।

