ট্রাম্পের ওপর ক্ষুব্ধ অ্যারিজোনার ল্যাটিনো ভোটাররা, ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র অভিযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে একসময় সক্রিয়ভাবে প্রচার চালিয়েছিলেন ২২ বছর বয়সী ফার্নান্দো নুনেজ। প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চেয়েছিলেন রিপাবলিকান প্রার্থীর জন্য। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের জয় এবং হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনে ভূমিকা রাখা সেই তরুণ এবার তাঁর সমর্থন থেকে সরে এসেছেন। আসন্ন নির্বাচনে ট্রাম্প-সমর্থিত রিপাবলিকান প্রার্থীদের ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
মেক্সিকান বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক নুনেজের অভিযোগ, ট্রাম্প নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেননি। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তিনি পুরোপুরি উল্টো পথে হাঁটছেন।’ বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের এই হতাশার কথা জানান।
নুনেজ একসময় ট্রাম্পের কয়েকটি প্রতিশ্রুতিতে আশাবাদী হয়েছিলেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানো, আন্তর্জাতিক সংঘাত বন্ধ করা এবং জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত তদন্তের সব নথি প্রকাশের অঙ্গীকার তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু এখন এসব বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তাঁর অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশে স্বচ্ছতার অভাব এবং ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ নিয়ে হতাশ নুনেজ। তাঁর মতে, এই যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে।
পেশায় বিক্রয় প্রতিনিধি নুনেজের মাসিক আয় প্রায় ১ হাজার ৬০০ ডলার। তিনি বলেন, গ্যাস, বিমা ও খাবারসহ প্রায় সবকিছুর দাম বেড়েছে। তাঁর অভিজ্ঞতায়, আগে কখনো এত বেশি দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হয়নি। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোরও বিরোধিতা করেন তিনি। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাতে জড়ানোর প্রয়োজন ছিল না।
আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে কোনো রিপাবলিকান কিংবা ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা নেই নুনেজের। বরং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্য থেকে কাউকে বেছে নিতে চান তিনি।
ল্যাটিনো ভোটে পরিবর্তনের ইঙ্গিত
অ্যারিজোনার ইউমা কাউন্টি যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাটিনো জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে এই জনগোষ্ঠীর একটি অংশ রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকেছিল। এর ফলে ট্রাম্প ওই অঞ্চলে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর চেয়ে বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হন।
কৃষিপ্রধান শহর সোমারটনে ল্যাটিনো জনগোষ্ঠীর বসবাস প্রায় শতভাগ। ঐতিহ্যগতভাবে শহরটির অধিকাংশ বাসিন্দা ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করলেও ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রায় ৪০ শতাংশ ভোটার ট্রাম্পকে ভোট দেন।
শহরটির মেয়র জেরার্ডো আনায়ার মতে, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে মূল্যস্ফীতি এবং সীমান্ত দিয়ে বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর প্রবেশ নিয়ে অসন্তোষের কারণে অনেক ভোটার ট্রাম্পের দিকে ঝুঁকেছিলেন। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল মূলত বাইডেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ভোট।
তবে মেয়র মনে করেন, ট্রাম্পের প্রতি আস্থা রাখা অনেক ভোটার এখন বাস্তব অভিজ্ঞতার কারণে হতাশ হচ্ছেন। শহরের সুপারমার্কেট থেকে শুরু করে স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন আলোচনায়ও পণ্যের বাড়তি দাম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ পাচ্ছে।
এএফপির সঙ্গে কথা বলা বাসিন্দারা মেক্সিকান খাবার কারনে আসাদা এবং ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়েও ক্ষোভ জানিয়েছেন। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে মরুভূমিতে অফ-রোড গাড়ি চালানোর মতো জনপ্রিয় বিনোদনও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
অভিবাসননীতি নিয়েও অসন্তোষ
ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসননীতিও ল্যাটিনো জনগোষ্ঠীর একাংশের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সীমান্তে অবৈধ প্রবেশের সংখ্যা কমলেও দেশজুড়ে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
মেক্সিকান বংশোদ্ভূত এক বাগান পরিচর্যাকারী এএফপিকে বলেন, অপরাধে জড়িত নন—এমন অভিবাসীরাও বহিষ্কারের শিকার হচ্ছেন বলে তাঁর আশঙ্কা। ট্রাম্প অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তা যথাযথভাবে হচ্ছে না বলে মনে করেন তিনি। এ কারণে ট্রাম্পকে বর্ণবাদী বলেও মন্তব্য করেন ওই ব্যক্তি।
তবে ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষ থাকলেই যে সবাই ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করছেন, তা নয়। ওই বাগান পরিচর্যাকারী এবার কাউকেই ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সোমারটনের সেলুনকর্মী ৫২ বছর বয়সী জাইমে সানচেজও এখনো নিজের ভোটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। শুরুতে গর্ভপাতবিরোধী অবস্থান এবং পারিবারিক মূল্যবোধের কথা বিবেচনা করে তিনি ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু অভিবাসননীতির কারণে পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা তাঁকে উদ্বিগ্ন করছে।
সানচেজের মতে, কোনো অপরাধে জড়িত নন এমন অভিবাসীদের বহিষ্কার করা হলে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া তাঁদের সন্তানদের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটতে পারে। এতে পরিবার ও শিশুদের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ধর্মীয় মূল্যবোধে রিপাবলিকানদের প্রতি সমর্থন
অন্যদিকে প্রতিবেশী সান লুইস শহরের রক্ষণশীল ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টান ধর্মযাজক হোসে ম্যানুয়েল কাস্ত্রো মনে করেন, ল্যাটিনো ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে রিপাবলিকানদের প্রতি সমর্থন বাড়তে পারে।
৭৫ বছর বয়সী এই ধর্মযাজকের মতে, ধর্মীয় বিশ্বাস ও পারিবারিক মূল্যবোধের কারণে অনেক ল্যাটিনো ভোটার ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে একমত নন। বিশেষ করে গর্ভপাত এবং ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের অধিকার নিয়ে দুই দলের অবস্থান তাঁদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
কাস্ত্রো বলেন, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কিছু নীতি ধর্মীয় গ্রন্থের শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন অনেক ধর্মপ্রাণ ভোটার। তাঁর ধারণা, অসন্তোষের কারণে কেউ কেউ এবার প্রতিবাদী ভোট দিলেও ল্যাটিনোদের একটি অংশ ভবিষ্যতেও রিপাবলিকানদের সমর্থন করতে পারে।
সব মিলিয়ে অ্যারিজোনার ইউমা কাউন্টিতে ল্যাটিনো ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি অসন্তোষ বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে এই ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে যাবে, নাকি ভোটারদের একটি অংশ ভোট দেওয়া থেকেই বিরত থাকবে—তা নির্বাচনের ফলেই স্পষ্ট হবে।
